খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মঙ্গলবার (১৮ জুন) দুপুরে চরতী ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ড গাইনার বাড়ি এলাকায় আবু ছালেক নামে এক ব্যক্তি বেড়াতে আসেন। এসময় সিএনজিচালিত অটোরিকশার ভাড়া নিয়ে গাড়িচালকের সঙ্গে তার বাকবিতণ্ডা হয়।
একপর্যায়ে গাড়িচালক জিহানের সঙ্গে হাতাহাতি হয়। জিহান বিষয়টি চরতীর ৮ নম্বর ওয়ার্ডের ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য সাইফুলকে জানায়। সঙ্গে সঙ্গে সাইফুল তার অস্ত্রে সজ্জিত বাহিনী নিয়ে ৭ নম্বর ওয়ার্ডের গাইনা বাড়িতে হামলা চালায়।
শুরুতে তারা ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি নুর মোহাম্মদের বাড়িতে ভাঙচুর চালায়। এরপর তারা বেশ কয়েকটি বাড়িঘর ভাঙচুর করে। এসময় সাইফুল বাহিনীর লোকজন স্থানীয়দের মারধর করে।
পরবর্তীতে স্থানীয়রা সাইফুল বাহিনীকে প্রতিহত করতে চেষ্টা করে। কিন্তু অস্ত্রে সজ্জিত সাইফুল বাহিনীর হামলায় স্থানীয় অন্তত ২০ জন আহত হয়।
তাদের মধ্যে আতিক নামে একজনকে আটকে সাইফুল বাহিনী মারধর করে। পরবর্তীতে মুমূর্ষু অবস্থায় তাকে একটি ভাঙা পরিত্যক্ত অস্ত্র দিয়ে পুলিশে সোপর্দ করে।
স্থানীয়রা জানান, মারধর করে অস্ত্র দিয়ে ফাঁসানো সাইফুলের পুরনো অভ্যাস। এর আগে পারিবারিক দ্বন্দ্বের জেরে মিজবাহ নামের দশম শ্রেণির এক ছাত্রকে মারধর করে পুলিশে সোপর্দ করেছিল সাইফুল।
এছাড়া আশরাফ নামে এক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীকে একই কায়দায় পুলিশে সোপর্দের অভিযোগ রয়েছে সাইফুলের বিরুদ্ধে।
ঘটনার বিষয়ে স্থানীয় মো. জাহাঙ্গীর বলেন, মারধর করে অস্ত্র দিয়ে ফাঁসানো সাইফুলের পুরনো অভ্যাস। স্থানীয়রা সাইফুল বাহিনীর কাছে অসহায়। মুখ খুলতে ভয় পায়। আমরা আইনশৃঙখলাবাহিনীর কাছে তার শাস্তি চাই।
নাদিম মাহমুদ নামে আরেক স্থানীয় বলেন, জিহান সাইফুলের লোক। জিহান নিয়ে ৭ নম্বর ওয়ার্ডের গাইনা বাড়িতে হামলা চালায় সাইফুল।
এতে ২০ জন আহত হয়। তাদের মধ্যে আতিক নামে একজনকে আটকে সাইফুল বাহিনী মারধর করে। পরবর্তীতে মুমূর্ষু অবস্থায় তাকে একটি ভাঙা পরিত্যক্ত অস্ত্র দিয়ে পুলিশে সোপর্দ করে।
তবে সাতকানিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) প্রিটন সরকার বলেন, এই বিষয়ে মামলা হয়েছে। আমরা তদন্ত করছি, দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এই বিষয়ে জানতে সাইফুল বাহিনীর প্রধান ও চরতী ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য সাইফুলের মুঠোফোনে বারবার যোগাযোগ করেও তাকে পাওয়া যায়নি। খুদে বার্তা দিয়েও সাড়া মেলেনি।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আন্তঃজেলা ডাকাত সর্দার মৃত নুর আহমেদের ছেলে সাইফুল একসময় প্রবাসী ছিলেন। ২০১৭ সালের দিকে দেশে ফিরে এলাকায় গঠন করেন কিশোর গ্যাং।
চরতীর বুক চিরে বয়ে যাওয়া সাঙ্গু নদীর বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে বালু উত্তোলন শুরু করেন। একই সঙ্গে ইয়াবার ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নেয় সাইফুল। ইয়াবা এবং বালু বিক্রির টাকা বাহিনীর জন্য কেনেন অস্ত্র।
এরপর থেকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এবং ব্যক্তি থেকে চাঁদা আদায় করতে থাকে এই বাহিনী। সাতকানিয়ার রাজনীতিতে যখন যে প্রভাবশালী ছিলেন তার ছায়ায় আশ্রয় নিয়েছে এই সাইফুল।
২০২২ সালে স্থানীয় সংসদ সদস্য আবু রেজা নদভীর সহায়তায় ইউপি মেম্বার নির্বাচিত হন সাইফুল। এরপর তাকে ছেড়ে উপজেলা চেয়ারম্যান এম এ মোতালেবের কাছে আশ্রয় নেন তিনি।
২০২৪ সালে অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে মোতালেব সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এরপর থেকে আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন সাইফুল এবং তার বাহিনী।
গত ছয় মাসে সাতকানিয়ার চরতি-আমিলাইশ এলাকায় অন্তত ৩০টি সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের ঘটনা ঘটিয়েছে এই বাহিনী। থানা পুলিশ জানিয়েছে, এরমধ্যে কমপক্ষে ২০টি অভিযোগ জমা পড়েছে এই বাহিনীর বিরুদ্ধে। বাকিরা ভয়ে মুখ খুলেনি।
এরমধ্যে জাতীয় নির্বাচনের দিন সন্ধ্যায় দক্ষিণ চরতিতে নৌকার সমর্থকদের বাড়ি-ঘর ও দোকানে হামলা ও লুটপাট চালায় সাইফুল বাহিনী।
এই সময় ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক ইউপি সদস্য ইলিয়াছ শাহীনের ফার্মাসি ও কৃষক লীগ নেতা ফারুকের বাড়ি ও ডেকোরেশনের দোকানে লুটপাট ও ভাঙচুর চালানো হয়। চরতী ইউনিয়ন পরিষদ কার্য়ালয়ে ঢুকে বর্তমান চেয়ারম্যান রুহুল্লাহ চৌধুরীকে মারধর করে সাইফুল বাহিনী।
দক্ষিণ চরতী এলাকার ডিশ ব্যবসায়ী নুর মোহাম্মদের বাড়িতে হামলা চালিয়ে তাকে পরিবারসহ বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করে সাইফুল বাহিনী। নির্বাচনের পর থেকে এখনো ঘর ছাড়া নুর মোহাম্মদের পরিবার।
চরতী ইউনিয়ন ছাত্রলীগ সভাপতি মাইনুদ্দিনকে অপহরণ করে মারধর দক্ষিণ চরতির আরাফাত সিকদারকে মারধর করে এই সাইফুল বাহিনী।
নির্বাচনের আগে ২১ ডিসেম্বর দক্ষিণ চরতি কাটাখালী ব্রিজের পাশে নৌকার পথ সভায় অস্ত্র ও লাঠি-সোটা নিয়ে হামলা চালায় সাইফুল ও তার বাহিনী।
এর দুই দিন আগে ১৯ ডিসেম্বরও নৌকার পথসভা শেষে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক ইউপি সদস্য ইলিয়াছ শাহীনকে মারধর করে সাইফুল বাহিনী।
২০১৮ সালে সন্ত্রাসী সাইফুল বাহিনীর অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে ভিটে-মাটি ছেড়ে যায় দক্ষিণ চরতির ১০ পরিবার। নারী ও শিশুসহ এসব পরিবারের প্রায় অর্ধ শতাধিক লোকজন দীর্ঘ এক বছর নিজেদের ভিটে বাড়ি থেকে উচ্ছেদ হওয়ার পর উদ্ভাস্তুর মতো দিনযাপন করছে।
বাড়ি-ভিটে ফিরে পেতে ২০১৯ সালের ২৭ এপ্রিল চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনও করেন উদ্ভাস্তু পরিবারসহ এলাকার বিক্ষুব্ধ লোকজন।