ই-পেপার | শনিবার , ৩০ আগস্ট, ২০২৫

বন্দরের সাবেক চেয়ারম্যানের দোসররা লুটেপুটে খাচ্ছে ভান্ডার বিভাগ

  • দুর্নীতি, জোরপূর্বক গুম ও হত্যাসহ বিভিন্ন অভিযোগে নৌবাহিনী থেকে চাকরিচ্যুত বন্দরের সাবেক চেয়ারম্যান সোহায়েলকে সরিয়ে নেওয়া হলেও গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল তবিয়তে আছেন তার দোসররা।
  • অসাধু উপায়ে প্রায় ১০ কোটি টাকার কাজ পেয়ে পুরো ভান্ডার বিভাগ নিয়ন্ত্রণে নেয় মজুমদার এন্টারপ্রাইজ ও মেসার্স আইকন
  • দুটি প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দিতে ই-জিপি টেন্ডারে একক কার্যাদেশের শর্ত
  • ক্রয়াদেশের আগেই প্রায় কোটি টায়ার সরবরাহ করেছে মজুমদার এন্টারপ্রাইজ।

দুর্নীতি, জোরপূর্বক গুম ও হত্যাসহ বিভিন্ন অভিযোগে নৌবাহিনী থেকে চাকরিচ্যুত চট্টগ্রাম বন্দরের সাবেক চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ সোহায়েলের দোসররা লুটেপুটে খাচ্ছে বন্দরের ভান্ডার বিভাগ।
সোহায়েলের আমলে অসাধুভাবে দুটি প্রতিষ্ঠানকে ভান্ডার বিভাগে প্রতিষ্ঠিত করা হয়।

কিন্তু দেশের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর তাকে বন্দর থেকে সরিয়ে নেওয়া হলেও গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল তবিয়তে আছেন দোসররা। তারা এবার ওই দুটি প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দিতে ই-জিপি টেন্ডারে একক কার্যাদেশের শর্ত জুড়ে দেন।

প্রসঙ্গত, ২০২৩ সালের ১২ এপ্রিল চট্টগ্রাম বন্দরের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন মোহাম্মদ সোহায়েল। দেশের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর গত ৭ আগস্ট তাকে চট্টগ্রাম বন্দর চেয়ারম্যানের পদ থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়।

সোহায়েরলের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, জোরপূর্বক গুম এবং হত্যার মতো গুরুতর অভিযোগে নৌবাহিনী থেকে বাধ্যতামূলক অবসর এবং ২০২৪ সালের ১৯ আগস্টে তাকে বাহিনী থেকে চাকরিচ্যুত করা হয়।

দুদক সূত্র ও টেন্ডার নথি অনুযায়ী, অনেক বছর থেকে চট্টগ্রাম বন্দরের ভান্ডার বিভাগ আনুমানিক ১ কোটি থেকে দেড় কোটি টাকা পর্যন্ত টেন্ডার আহবান করে মালামাল ক্রয় করে আসছে। বিগত স্বৈরাচারের দোসর এবং সাবেক চেয়ারম্যান বন্দরের ভান্ডার বিভাগে দুটি প্রতিষ্ঠানকে প্রতিষ্ঠিত করতে ই-জিপি’র পরিবর্তে ম্যানুয়ালি টেন্ডার আহবান করে।

এর প্রেক্ষিতে ২০২৪ সালের ২৭ মার্চ মেসার্স মজুমদার এন্টারপ্রাইজকে ক্রয় আদেশ মূলে ৩ কোটি ৯৬ লাখ ২৬ হাজার টাকা এবং একই বছরের ৯ সেপ্টেম্বর মেসার্স আইকনকে ৫ কোটি ২১ লাখ টাকার কার্যাদেশ প্রদান করা হয়। তবে এই দুুটি টেন্ডারে একক কার্যাদেশের কোন শর্ত ছিল না।

কিন্তু চট্টগ্রাম বন্দর চেয়ারম্যানের পদ থেকে সাবেক চেয়ারম্যান সোহায়েলকে সরিয়ে নেওয়া হলেও গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল তবিয়তে আছেন তার দোসররা। এই সুযোগে উল্লেখিত দুটি প্রতিষ্ঠান ছাড়া অন্যরা যাতে টেন্ডারে অংশগ্রণের অযোগ্য হয় তার জন্য কৌশলে ই-জিপি’র শর্ত হিসেবে একক কার্যাদেশে ২ কোটি ৪০ লাখ টাকার মামলামাল সরবরাহ করার অভিজ্ঞতার শর্ত জুড়ে দেন।

যার প্রেক্ষিতে গত টেন্ডার আইডি নং ১০৩৩১৭৭ ও ১০৩৩৮৭০ ইজিপি’র মাধ্যমে টায়ার টিউব এর দরপত্র আহবান করা হলেও শর্তের কারণে চট্টগ্রাম বন্দরের অন্যান্য ছোট সরবরাহকারীরা টেন্ডারে অংশগ্রহণ করতে পারে নাই।

এমনকি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান মেসার্স ডি.আর. এন্টারপ্রাইজ টেন্ডারে সর্বনিম্ন দরদাতা হওয়ার পরও উক্ত শর্তের কারণে কাজ দেওয়া হচ্ছে না। আইডি নং ১০৩৩১৭৭ টেন্ডারে প্রতিষ্ঠানটির সর্বনিম্ন দর ৩ কোটি ৪৯ লাখ ৯৩ হাজার ৩২০ টাকা এবং ২য় সর্বনিম্ন দর মেসার্স মজুমদার এন্টারপ্রাইজ এর ৩ কোটি ৫৭ লাখ ২৮ হাজার ৮০০ টাকা, যাহা সর্বনিম্ন দর অপেক্ষা ৭ লাখ ৩৫ হাজার ৪৮০ টাকা বেশী হওয়া সত্বেও দোসরদের পছন্দের ব্যক্তির প্রতিষ্ঠান মেসার্স মজুমদার এন্টারপ্রাইজকে কার্যাদেশ দেওয়ার জন্য তোড়জোড় চেষ্টা চলছে।

ভান্ডার বিভাগের সংশ্লিষ্টরা জানান, কমিটি এরইমধ্যে ২য় সর্বনিম্ন দরদাতা প্রতিষ্ঠান মেসার্স মজুমদার এন্টারপ্রাইজকে কাজ দেওয়ার জন্য যাবতীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছে। এখন ক্রয়াদেশের অপেক্ষায় আছে। তার আগেই মজুমদার এন্টারপ্রাইজ সিএসটি ব্রান্ডের ৭০ লাখ টাকার টায়ার সরবরাহ করেছে।

এবিষয়ে জানতে চট্টগ্রাম বন্দরের ভান্ডার বিভাগের কন্ট্রোলার অব স্টোরস ও টেন্ডার আহব্বায়ক মো. আবদুল হান্নানের সাথে মুঠোফোনে একাধিবার চেষ্টা করেও কথা বলা সম্ভব হয়নি।

অভিযোগ রয়েছে, মেসার্স মজুমদার এন্টারপ্রাইজ এবং মেসার্স আইকন প্রতিষ্ঠান দুটি স্বৈরাচার সরকারের দোসর বন্দর কর্তৃপক্ষের সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সোহায়েল এর ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত। গত ৭ থেকে ৮ বছরে বন্দরের ভান্ডার বিভাগের ৬০ শতাংশ টেন্ডার এককভাবে ভাগিয়ে নিয়েছে।

প্রতিষ্ঠান দুটি কার্যাদেশ পাওয়ার পর যথাসময়ে মালামাল সরবরাহ না করে আংশিক সরবরাহ করে আংশিক পেমেন্ট নিয়ে কার্যাদেশের সময় বর্ধিত করে বন্দরের টাকায় বন্দরকে মামলামাল সরবরাহ করে। এতে একদিকে বন্দরের অর্থ ও সময় অপচয় হয় অন্যদিকে টেন্ডারে প্রতিযোগিতার সংস্কৃতি বিলুপ্ত হয়।

এ বিষয়ে জানতে মেসার্স মজুমদার এন্টারপ্রাইজের শহীদুজ্জামান খোকন এবং মেসার্স আইকনের কর্ণধার গোলাম মাওলার সাথে একাধিকবার চেষ্টা করে কথা বলা সম্ভব হয়নি।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বন্দরের সদস্য (প্রকৌশল) ও প্রাক্কালন অনুমোদনকারী কমডোর কাওছার রশিদ বলেন, পিপিআর এ একটি রুল আছে- যে যত টাকার কাজ, তার ৭৫ শতাংশ একটি কার্যাদেশের কাজ করতে হবে। ওইটা সেখানে লিখে দেওয়া হয়েছে, আগে শর্তটা হয়ত ছিলো না। আগে তো আমরা তো আমরা অনেক কিছু করতে পারিনি।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমি পয়েন্টগুলো নিলাম। আমি দেখবো। আমরা তো আসলে সবসময় পিপিআর এক্সপার্ট হয়ে যায়নি। তাই সবকিছু কিন্তু একেবারে টু দ্য পয়েন্ট এ দেখতে পারি না। আলোচনার প্রেক্ষিতে যদি সুযোগ থাকে আমরা ওই বিষয়গুলো সরিয়ে দিব।