ই-পেপার | রবিবার , ১৪ জুলাই, ২০২৪

বিজয়ের মাসে সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জ

২০১৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে আওয়ামী লীগ দুর্নীতির ব্যাপারে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণের অঙ্গীকার করেছিল, কিন্তু গত চার বছরে সরকার এই অঙ্গীকার পূরণকে সত্যিকার অগ্রাধিকার দেয়নি।

২০২১ সালে আমাদের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর বছরে প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ সূচক বিশ্বকে জানান দিয়ে চলেছিল যে বাংলাদেশ একটি আত্মনির্ভরশীল এবং দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতিতে পরিণত হতে চলেছে। কিন্তু ২০২২ সালের ডিসেম্বর মাসের শুরুতে বাংলাদেশের অর্থনীতি একটি বিপজ্জনক সংকটে নিমজ্জমান—তা হলো, দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের অভূতপূর্ব পতনের ধারা। ২০২১ সালের আগস্টে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে ৪৮ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছিল। ওই ৪৮ বিলিয়ন ডলার থেকে এক বছর দুই মাসের মধ্যেই রিজার্ভ ২২ বিলিয়ন ডলার কমে নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নের পাওনা পরিশোধের পর (আইএমএফের নির্দেশনা অনুযায়ী নতুন হিসাব পদ্ধতি অনুসরণের কারণে) ২৬ বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে এসেছে। এহেন পতনের ধারা অত্যন্ত বিপজ্জনক। ইতিমধ্যে দেশের আমদানি নিয়ন্ত্রণের নানাবিধ ব্যবস্থা গৃহীত হওয়ায় গত আগস্ট মাস থেকে এলসি খোলা ক্রমান্বয়ে কমে এসেছে, কিন্তু হুন্ডি পদ্ধতিতে রেমিট্যান্স প্রেরণকে কোনোমতেই নিরুৎসাহিত করা যাচ্ছে না। হুন্ডি ব্যবসার রমরমা অবস্থা ঘটাচ্ছে আন্তব্যাংক লেনদেনের ক্ষেত্রে বিদ্যমান ডলারের দামের সঙ্গে কার্ব মার্কেটের ডলারের দামের পার্থক্য ৭-৮ টাকায় স্থির থাকা, যার প্রধান কারণ হুন্ডি প্রক্রিয়ায় বিদেশে পুঁজি পাচারের চাহিদার ক্রমবর্ধমান ব্যাপক উল্লম্ফন। অতএব, এই ক্রমবর্ধমান চাহিদাকে কমিয়ে আনতে না পারলে এই দু-দুটি দামের পার্থক্যকে কমিয়ে আনা যাবে না। শুধু আন্তব্যাংক লেনদেনে ডলারের দামকে বাজারের সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ করার জন্য ক্রমান্বয়ে পদক্ষেপ নিলে সুফল পাওয়া যাবে না। হুন্ডি-ডলারের চাহিদা এত বেশি শক্তিশালী থাকলে কার্ব মার্কেটেও ডলারের দাম ক্রমেই বাড়িয়ে পার্থক্যটা ৭-৮ টাকায় রেখে দেবে হুন্ডিওয়ালারা। সে জন্যই বলছি, হুন্ডি ডলারের চাহিদাকে দমন করতে চাইলে প্রয়োজন হবে দুর্নীতি দমনকে সত্যিকারভাবে শক্তিশালী করা, কারণ হুন্ডি ডলারের চাহিদার প্রধান অংশটা আসছে দুর্নীতিবাজ আমলা, প্রকৌশলী, সামরিক অফিসার, লুটেরা রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী এবং ব্যাংকঋণ গ্রহীতাদের কাছ থেকে।

২০২০ সালে করোনাভাইরাস মহামারি শুরু হওয়ার পর চাহিদা এবং সরবরাহ উভয় দিক থেকে হুন্ডির ব্যবসা অনেকখানি গুটিয়ে গিয়েছিল, যার সুফল হিসেবে বাংলাদেশ ২০১৯-২০ এবং ২০২০-২১ অর্থবছরে ফরমাল চ্যানেলে রেমিট্যান্সের উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি অর্জনে সমর্থ হয়েছিল। এই প্রবৃদ্ধির কারণেই বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দ্রুত বেড়ে গিয়ে ২০২১ সালের আগস্টে ৪৮ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করেছিল। ২০২১ সালের দ্বিতীয়ার্ধে যখন করোনাভাইরাস মহামারির তাণ্ডব কমে আসে, তখন আবার চাঙা হয়ে ওঠে হুন্ডির ব্যবসা। ২০২২ সালের ১১ সেপ্টেম্বর সরকারের ক্রিমিনাল ইনভেস্টিগেশন ডিপার্টমেন্টের (সিআইডি) বরাত দিয়ে দেশের পত্রপত্রিকায় খবর বেরিয়েছে যে শুধু হুন্ডি-প্রক্রিয়ায় দেশ থেকে বর্তমানে বছরে ৭৫ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়ে যাচ্ছে। এর সঙ্গে আমদানির ওভারইনভয়েসিং, রপ্তানির আন্ডারইনভয়েসিং এবং রপ্তানি আয় দেশে ফেরত না আনার মতো মূল সমস্যাগুলো যোগ করলে দেখা যাবে প্রতিবছর এখন কমপক্ষে দেড় লাখ কোটি টাকার সমপরিমাণের বৈদেশিক মুদ্রা থেকে বাংলাদেশ বঞ্চিত হচ্ছে। এর মানে, বাংলাদেশ থেকে বছরে কমপক্ষে ১৫-১৬ বিলিয়ন ডলার পুঁজি এখন বিদেশে পাচার হয়ে চলেছে (অথবা ডলার দেশে আসছে না), যার অর্ধেকের মতো পাচার হচ্ছে হুন্ডি-প্রক্রিয়ার বেলাগাম বিস্তারের মাধ্যমে।

২০২১-২২ অর্থবছরে প্রবাসী বাংলাদেশিদের প্রেরিত রেমিট্যান্স ২০২০-২১ অর্থবছরের ২৪ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ডলার থেকে ১৫ শতাংশ কমে ২১ দশমিক শূন্য ৩ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে, যার প্রধান কারণ হুন্ডি-প্রক্রিয়ায় রেমিট্যান্স প্রেরণ আবার চাঙা হওয়া। ২০২২ সালের আগস্ট, সেপ্টেম্বর, অক্টোবর ও নভেম্বর মাসে ফরমাল চ্যানেলে রেমিট্যান্স গত বছরের ওই মাসগুলোর তুলনায় কমে গেছে, যাকে ‘অশনিসংকেত’ বলা চলে।

২০১৮ সাল থেকে বাংলাদেশ জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাউন্সিল নির্ধারিত ‘উন্নয়নশীল দেশের’ ক্যাটাগরিতে উত্তরণের প্রক্রিয়া শুরু করেছে। ওই প্রক্রিয়ার সফল পরিসমাপ্তির পর ২০২৪ সালে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে পরিগণিত হবে। (অবশ্য করোনাভাইরাস মহামারির বিপর্যয়ের কারণে স্বল্পোন্নত দেশের প্রাপ্য সুবিধাগুলো ২০৩৩ সাল পর্যন্ত বহাল রাখার জন্য বাংলাদেশ জাতিসংঘের কাছে আবেদন করেছে। ফলে ২০২৬ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের প্রাপ্য সুবিধাগুলো ভোগ করতে পারবে)। এর আগে ২০১৫ সালে বিশ্বব্যাংকের ‘নিম্ন আয়ের দেশ’ ক্যাটাগরি থেকে বাংলাদেশ ‘নিম্নমধ্যম আয়ের দেশ’ ক্যাটাগরিতে উত্তীর্ণ হয়েছে। দুই দশক ধরে বাংলাদেশের জিডিপির প্রবৃদ্ধির হার ৫ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৮ দশমিক ২ শতাংশে পৌঁছে গিয়েছিল। করোনাভাইরাস মহামারির আঘাতে ২০১৯-২০ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির হার ৫ দশমিক ২৪ শতাংশে নেমে গেলেও বাংলাদেশের মাথাপিছু জিএনআই ২০১৯ অর্থবছরের ১ হাজার ৯০৯ থেকে বেড়ে ২০২২ সালের ৩০ জুন ২ হাজার ৮২৪ ডলারে পৌঁছেছে বলে সরকার দাবি করছে। ২০২০ সালে বাংলাদেশের মাথাপিছু নমিনাল জিডিপি ভারতের মাথাপিছু জিডিপিকে ছাড়িয়ে গেছে। মাথাপিছু জিডিপির বিচারে বাংলাদেশ পাকিস্তানকে বহু আগেই ছাড়িয়ে গেছে, ২০২০ সালে ভারতকেও ছাড়িয়ে যায়।

কিন্তু মাথাপিছু জিডিপি যেহেতু একটি গড় সূচক, তাই এই প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে যদি দেশে আয়বণ্টনে বৈষম্যও বাড়তে থাকে, তাহলে নিম্নবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ প্রবৃদ্ধির ন্যায্য হিস্যা থেকে বঞ্চিত থেকে যায়। ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশের জিনি সহগ ছিল মাত্র শূন্য দশমিক ৩৩, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০১৬ সালের খানা আয় ও ব্যয় জরিপ মোতাবেক সেটা বেড়ে শূন্য দশমিক ৪৮৩-এ পৌঁছে গেছে। ধনাঢ্য ও উচ্চবিত্ত জনগোষ্ঠীর দখলে জিডিপির ক্রমবর্ধমান অংশ পুঞ্জিভবনের ফল কী হতে পারে, তা নাটকীয়ভাবে ধরা পড়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ‘ওয়েলথ এক্স’-এর প্রতিবেদনে, ২০১২ সাল থেকে ২০১৭—এই পাঁচ বছরে অতিধনীর সংখ্যা বৃদ্ধির বিচারে বাংলাদেশ বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়ে গেছে। ওই পাঁচ বছরে বাংলাদেশে ৩০ মিলিয়ন ডলারের বেশি সম্পদের মালিক অতিধনীর সংখ্যা বেড়েছে বার্ষিক ১৭ দশমিক ৩ শতাংশ হারে। দেশের আয় এবং সম্পদের এহেন পুঞ্জিভবন বাংলাদেশের রাজনীতিকে ‘ক্রোনি ক্যাপিটালিজমের’ নিকৃষ্ট নজির হিসেবে বিশ্বের কাছে তুলে ধরছে। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ রাষ্ট্রের চারটি মূল নীতির মধ্যে ২০১০ সালে সুপ্রিম কোর্টের ঐতিহাসিক রায়ের মাধ্যমে সমাজতন্ত্র পুনঃস্থাপিত হয়েছে। ২০১১ সালে সংসদে পাস হওয়া সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ক্ষমতাসীন মহাজোট সে রায়কে সংবিধানে ফিরিয়ে আনলেও সরকার এখনো ‘মুক্তবাজার অর্থনীতির’ অহিফেনের মৌতাতে মেতে রয়েছে।

২০০১-০৫—ওই পাঁচ বছরে পাঁচবার বাংলাদেশ দুর্নীতিতে বিশ্বচ্যাম্পিয়নশিপ অর্জন করেছিল, এবার বিশ্বচ্যাম্পিয়নশিপ অর্জন করল ধনকুবেরের সংখ্যাবৃদ্ধির দৌড়ে। একটি সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রে আয়বৈষম্য এভাবে বাড়তেই পারে না, যদি শাসকেরা সমাজতন্ত্রকে ‘বাত কা বাত’ বানিয়ে না ফেলে! এসব ধনাঢ্য ব্যক্তির কাছেই দেশের খেলাপি ব্যাংকঋণের ৮০ শতাংশেরও বেশি আটকে রয়েছে এবং খেলাপি ঋণের সিংহভাগ বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা সংস্থা গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইনটিগ্রিটির হিসাব মোতাবেক এক দশক ধরে প্রতিবছর বাংলাদেশ থেকে বিদেশে পুঁজি পাচার হয়ে চলেছে গড়ে ৭-৯ বিলিয়ন ডলার, এখন সরকারের অঙ্গ-প্রতিষ্ঠান সিআইডি বলছে, শুধু হুন্ডি-প্রক্রিয়াতেই প্রতিবছর পুঁজি পাচার হচ্ছে ৭৫ হাজার কোটি টাকা। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ২০২১ সালের দুর্নীতির র‍্যাঙ্কিং অনুযায়ী, বাংলাদেশ আফগানিস্তানের পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ।

২০১৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে আওয়ামী লীগ দুর্নীতির ব্যাপারে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণের অঙ্গীকার করেছিল, কিন্তু গত চার বছরে সরকার এই অঙ্গীকার পূরণকে সত্যিকার অগ্রাধিকার দেয়নি। হুন্ডি-প্রক্রিয়ায় বিদেশে পুঁজি পাচারের সঙ্গে দুর্নীতির ওতপ্রোত সম্পর্ক রয়েছে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে সত্যিকারভাবে কঠোর না হলে পুঁজি পাচার দমন করা অসম্ভব। পুঁজি পাচার দমন না করলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পতন থামানো যাবে না। সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকের গাফিলতি এবং অদক্ষতার কারণেই বিদেশে ক্রমবর্ধমান পুঁজি পাচার বাংলাদেশের প্রধান সমস্যা হিসেবে অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত করে চলেছে। আমদানি বাণিজ্যে ব্যাপক ওভারইনভয়েসিং, রপ্তানি বাণিজ্যে ব্যাপক আন্ডারইনভয়েসিং, হুন্ডি-প্রক্রিয়ায় ক্রমবর্ধমান পুঁজি পাচার এবং রপ্তানি আয়ের একটি বিরাট অংশ দেশে ফেরত না আনা পুঁজি পাচারের সবচেয়ে
চালু চারটি পদ্ধতি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে আহ্বান, দেশের জনগণের মধ্যে একটা সাধারণ ধারণা গড়ে উঠেছে যে বর্তমান অর্থমন্ত্রী চলমান অর্থনৈতিক বিপর্যয় মোকাবিলা করার জন্য যথেষ্ট দক্ষ নন। অতএব, অবিলম্বে অর্থ মন্ত্রণালয়ে নেতৃত্বের পরিবর্তন নিয়ে আসুন, কালক্ষেপণ সংকটকে শুধুই দীর্ঘস্থায়ী করবে।

লেখক: ড. মইনুল ইসলাম, অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়