ই-পেপার | রবিবার , ১৪ জুলাই, ২০২৪

ইসলামে কুরবানীর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট : গুরুত্ব ও আমাদের শিক্ষা

কোরবানি হলো মুসলিমদের একটি ইবাদত যা প্রতি বছর বিত্তবানদের ওপর আরোপিত হয় নির্দিষ্ট সময়ে। এই ইবাদাতের মাধ্যমে মুসলিম মহান আল্লাহতাআলার নৈকট্য লাভ করে থাকেন। আল্লাহর রাহে যথাসর্বস্ব বিলিয়ে দেয়ার এক আহ্বান নিয়ে প্রতি বছর আমাদের মাঝে হাজির হয় পবিত্র ঈদুল আযহা। মানব সৃষ্টির সূচনালগ্ন থেকে কুরবানির রেওয়াজ চলে আসছে। হযরত আদম-(আঃ)–এর দুসন্তান হাবিল ও কাবিল কুরবানি করেছিলেন। হাবিল ঐকান্তিক আগ্রহ ও নিষ্ঠার সাথে উৎকৃষ্ট জিনিস কুরবানি করলে তা আল্লাহর দরবারে গৃহীত হয়। পক্ষান্তরে কাবিল অনাগ্রহ ও নিকৃষ্ট জিনিস উৎসর্গ করলে তা প্রত্যাখ্যাত হয়। কুরবানি মানব সমাজে সবসময়ই কোন না কোনভাবে চালু ছিল।

আমাদের প্রতিবেশী হিন্দুসমাজেও বলিদান প্রথা চালু আছে। বর্তমান মুসলিম সমাজে চালুকৃত কুরবানি মূলত হযরত ইবরাহীম (আঃ) ও তাঁর পরিবারের চরম আত্মত্যাগের স্মরণ হিসেবেই চলে আসছে। হযরত ইবরাহীম (আঃ) যখন আদরের সন্তানের গলায় ছুরি চালাচ্ছিলেন সেসময় আল্লাহপাক এক জন্তুর বিনিময়ে হযরত ইসমাঈল (আঃ) ছাড়িয়ে নেন। এ দৃশ্য ছিল অভাবনীয় এবং আল্লাহর কাছে ছিল খুবই প্রীতিকর। সে সময়ে স্মরণ হিসেবে কিয়ামত পর্যন্ত তিনি পশু কুরবানি জারী করে দেন।

তাঁর ভাষায়-অনাগত মানুষদের জন্য এ বিধান চালু রেখে তার স্মরণ আমি অব্যাহত রাখলাম। শান্তি বর্ষিত হোক ইবরাহীমের প্রতি-আছ ছাফফাত : ১০৮-১০৯। কুরবানি সম্পর্কে সাহাবায়ে কেরামের প্রশ্নের জবাবে রসূল (সাঃ) বলেছিলেন তোমাদের পিতা ইবরাহীম (আঃ)-এর সুন্নাত। ইসলামী শরিয়তের পরিভাষায় জিলহজ্ব মাসের ১০ তারিখ থেকে শুরু করে ১২ই জিলহজ্ব দুপুর পর্যন্ত মহান আল্লাহর নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে প্রাণী জবাই করাকে ঈদুল আযহা বলা হয়।
কুরবানি অর্থ ত্যাগ স্বীকার। এর আর একটি অর্থ নৈকট্যলাভ। অর্থাৎ ত্যাগ স্বীকারের মাধ্যমেই নৈকট্যলাভ সম্ভব বিধায় একে বলা হয় কুরবানি। মানব সমাজেও এ নৈকট্য মূলত ত্যাগ স্বীকারের মাধ্যমেই অর্জিত হয়। মাতা-পিতার সাথে সন্তানের নৈকট্যের মূলে রয়েছে পরস্পরের জন্য ত্যাগ স্বীকার এবং স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে নৈকট্যের মূলেও রয়েছে ত্যাগের মনোবৃত্তি। আমাদের বৈষয়িক জীবনের সাফল্যও ত্যাগ ও কুরবানির বিনিময়েই কেবল সম্ভব। যে শিক্ষার্থী নিজের আরাম-আয়েশ ত্যাগ করে রাত জেগে লেখাপড়া করে সাফল্য তাকেই ধরা দেয়। ব্যবসা-বণিজ্য, চাষাবাদ, চাকরি, রাজনীতি সকল ক্ষেত্রে এটিই সত্য। রাজনীতি ক্ষেত্রে ত্যাগী নেতা-কর্মীদের মূল্যায়ন বহুল প্রচলিত।

এ পৃথিবীতে ত্যাগ স্বীকারের মানদন্ড মানুষকে মূল্যায়ন করা হয়। যে সন্তান তার পিতা-মাতার জন্য যত বেশি ত্যাগ স্বীকার করে সে তত বেশি নৈকট্য লাভ করে। তেমনিভাবে কর্মী তার ত্যাগের ভিত্তিতে নেতার এবং অফিস-আদালতে অধীনস্থরা ত্যাগের মানদন্ড বসের নৈকট্য লাভ করে। আল্লাহর সাথে মানুষের সম্পর্কটাও ত্যাগের মানদন্ডই নির্ণিত হয়। আল্লাহর নিষিদ্ধ কাজ থেকে নিজেকে বিরত রাখা ও তাঁর হুকুম পালনেও ত্যাগ অপরিহার্য। এমন কি মুসলমান হওয়ার জন্য প্রাথমিক শর্ত নামায ও যাকাতের মত ইবাদতও ত্যাগ ও ধৈর্য ছাড়া সম্ভব নয়। সকল ব্যস্ততা ও আরামদায়ক ঘুম উপেক্ষা করে পাঁচ ওয়াক্ত নামায জামায়াতের সাথে আদায় ও হিসেব করে যাকাত প্রদান অতি ত্যাগী ও ধৈর্যশীলদের পক্ষেই সম্ভব।

এরপর আল্লাহপাকের আরো নৈকট্যলাভের জন্য তাহাজ্জুদের নামায এবং দুঃস্থ মানুষ ও আল্লাহর দ্বীনের প্রয়োজনে অকাতরে নিজের ধনসম্পদ দান অসীম ধৈর্য ও ত্যাগের মাধ্যমেই সম্ভব। মানুষ আল্লাহপাকের সার্বক্ষণিক গোলাম ও প্রতিনিধি। গোলাম ও প্রতিনিধি হিসেবে মানুষ তার মনিব আল্লাহ তা‘য়ালার বিধান নিজেরা যেমন মেনে চলবে সাথে সাথে সমগ্র মানবগোষ্ঠী যাতে মেনে চলতে পারে সে পরিবেশ ও ব্যবস্থাপনা সৃষ্টি করাও তার দায়িত্ব এবং মানুষ যাতে প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারে সেজন্য নিয়ম-বিধানও আল্লাহপাক দিয়েছেন। তিনি তাঁর সৃষ্টি প্রথম মানুষ হযরত আদম (আঃ)-কে দুনিয়ায় প্রেরণের সময়ই এ প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে আমার পক্ষ থেকে যে হেদায়াত যাবে যারা তা অনুসরণ করবে তাদের কোন ভয় নেই-বাকারা ৩৮। সাথে সাথে সতর্কও করে দেন যে শয়তান তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু-বাকারা ১৬৮।

  • যারা ঈমানের পথ গ্রহণ করেছে তারা লড়াই করে আল্লাহর পথে আর যারা কুফুরির পথ অবলম্বন করেছে তারা লড়াই করে তাগুতের পথে। তোমরা শয়তানের সঙ্গী-সাথীদের বিরুদ্ধে লড়াই কর আর বিশ্বাস কর শয়তানের ষড়যন্ত্র আসলেই দুর্বল’ : আন নিসা ৭৬।

এ পৃথিবীতে আছে একদিকে নবীদের মাধ্যমে পাওয়া আল্লাহর বিধান যা অনুসরণ করে দুনিয়ায় শান্তি ও আখিরাতে নেয়ামতে ভরা জান্নাত এবং বিপরীত বিধান হলো শয়তানের যা অনুসরণ করে পৃথিবীতে অশান্তির সাথে সাথে দুঃখ-কষ্টের চিরস্থায়ী আবাস জাহান্নাম। দুটি পথই স্পষ্ট-প্রথমটি আল্লাহর বিধানের অনুসারী ঈমানদারদের পথ আর দ্বিতীয়টি শয়তানের অনুসারী কাফিরদের পথ। কুরআনের ভাষায়-যারা ঈমানের পথ গ্রহণ করেছে তারা লড়াই করে আল্লাহর পথে আর যারা কুফুরির পথ অবলম্বন করেছে তারা লড়াই করে তাগুতের পথে। তোমরা শয়তানের সঙ্গী-সাথীদের বিরুদ্ধে লড়াই কর আর বিশ্বাস কর শয়তানের ষড়যন্ত্র আসলেই দুর্বল’ : আন নিসা ৭৬।

ফলে পৃথিবীতে হক ও বাতিলের এক চিরন্তন দ্বন্দ-সৃষ্টির সূচনা থেকে চলে আসছে এবং কিয়ামত পর্যন্ত চলবে। আল্লাহপাকের পক্ষ থেকে যত নবী-রসূল এসেছেন তাঁদের প্রায় সবাইকে সমসাময়িক রাজশক্তির বিরুদ্ধে দাঁড় করানো হয়েছে এবং সবাই নানাভাবে নিপীড়িত-নির্যাতিত হয়েছেন। তাঁদেরকে নানা পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হয়েছে। অথচ তাঁরা সবাই ছিলেন সর্বোত্তম চরিত্রের অধিকারী এবং দেশ ও জাতির বিরুদ্ধে কোন শত্রুতা বা ষড়যন্ত্রের কোন অভিযোগ তাঁদের বিরুদ্ধে ছিল না। আল্লাহতায়ালা নিজে বা কোন জালেম শাসকের মাধ্যমে নবী-রসূল এবং তাঁদের সাথীদের পরীক্ষা নিয়েছেন। দুনিয়ার সামান্য জীবনের বিনিময়ে আখিরাতে অনন্তকালের জান্নাতি সুখ অবশ্যই ত্যাগ ও কুরবানির বিনিময়েই অর্জন করতে হবে। বান্দাহর পরীক্ষা গ্রহণ আল্লাহর এক স্থায়ী নিয়ম।

তাঁর ভাষায় আমরা অবশ্যই তোমাদেরকে ভয়-ভীতি, অনশন, জানমালের ক্ষতি ও আমদানি হ্রাসের দ্বারা পরীক্ষা করবো। বিপদ-মুছিবত উপস্থিত হলে যারা ধৈর্য ধারণ করে ও বলে যে, আমরা আল্লাহরই জন্য এবং তাঁর কাছেই ফিরে যাব। তাদের জন্য সুসংবাদ-বাকারা ১৫৫-১৫৬। অসংখ্য নবী-রসূল ও তাঁদের অনুসারীরা জীবন ও সম্পদের কুরবানি দিয়ে আল্লাহর পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে সম্মানিত হয়েছেন ও জান্নাতের স্থায়ী বাসিন্দা হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেছেন। আর তাঁদের মোকাবেলায় শয়তানের অনুসারী জালেম শাসক নমরুদ, ফেরাউন, শাদ্দাদ, হামান, কারুণ, আবু জেহেল, আবু লাহাব, উৎবা ও তাদের অনুসারীরা ইতিহাসে ধিকৃত হয়েছে এবং জাহান্নামের স্থায়ী বাসিন্দা হয়েছে।

আমরা যে পশু কুরবানি করি তা মূলত প্রতিকী। আজ থেকে সাড়ে চার হাজার বছর পূর্বে বর্তমান ইরাকে জন্মগ্রহণ করেছিলেন হযরত ইবরাহীম (আঃ)। তিনি এক পুরোহিত পরিবারে জন্মগ্রহণ করে চতুর্দিকে মূর্তিপূজার সয়লাব লক্ষ্য করেন এবং তাঁর পিতা স্বৈরশাসক নমরুদের প্রধান পুরোহিত ছিলেন। মূর্তির অসারতা প্রমাণের জন্য একদিন তিনি মন্দিরে প্রবেশ করে মূর্তিগুলো ভেঙ্গে ফেলেন। যেহেতু রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় মূর্তিপূজা তাই ইবরাহীম (আঃ)-এর এ আচরণকে রাষ্ট্রদ্রোহিতা বিবেচনা করে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদন্ড প্রদান করা হয়। ভবিষ্যতে কেউ যাতে এ জাতীয় আচরণ করার দুঃসাহস দেখাতে না পারে তজ্জন্য প্রকাশ্যে আগুনে পোড়ায়ে এ দন্ড কার্যকর করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। সেখান থেকে রক্ষা পাওয়ার পর তাঁর জাতির মধ্যে হেদায়াত প্রাপ্তির কোন সম্ভাবনা না দেখে দ্বীনের দাওয়াতের লক্ষ্যে দেশ ত্যাগ করে তিনি অজানা পথে রওয়ানা হন। নিজের রুটি-রুজির কোন চিন্তা ছিল না ছিল না কোন আশ্রয়ের ; কেবল আল্লাহরই ওপর ভরসা করে তাঁরই সন্তুষ্টির লক্ষ্যেই তাঁর এ যাত্রা।

এরপর আল্লাহরই নির্দেশে বৃদ্ধ বয়সে পাওয়া দুগ্ধপোষ্য শিশু ও স্ত্রীকে নির্জন স্থানে রেখে আসেন। পরীক্ষার পর পরীক্ষা। ছেলে দৌড়াদৌড়ি করার বয়সে উপনীত হলে সে সময় আল্লাহপাক নির্দেশ দেন প্রিয় জিনিসকে কুরবানি করতে। তিনি পশু কুরবানি করেন কিন্তু একই স্বপ্নের পুনরাবৃত্তি। তাঁর সবচেয়ে প্রিয় বস্তু তাঁর ছেলে। তাই তাঁর স্বপ্নের কথা স্ত্রী ও সন্তানকে জানান। তাঁরাও ছিলেন ইবরাহীম (আঃ)-এর মত মুসলিম। ছেলে বললেন-আব্বা আপনি তাই করুন যা করতে আদিষ্ট হয়েছেন-আছ ছাফফাত : ১০২। আল্লাহপাক এক বড় কুরবানির বিনিময়ে ছেলেকে ছাড়িয়ে নেন এবং পরবর্তীকালে স্মরণ হিসেবে ঘোষণা করে দেন। আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা এবং তাঁর সন্তুষ্টির লক্ষ্যে নিজের জীবন, ধন-সম্পদ ও রুটি-রুজির চিন্তা পরিহার, মাতৃভূমি, স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততির মায়া সবকিছু ত্যাগের এক উজ্জল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন হযরত ইবরাহীম (আ.)। ত্যাগ ও কুরবানি যত বড়, পুরস্কারও তত বড়। তাঁকে ইমাম ও মুসলিম জাতির পিতা হিসেবে ঘোষণা করা হয়। হজ্বের অনুষ্ঠানাবলীর মধ্যে ইবরাহীম (আঃ)-এর পরিবারের অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে। যেমন-মাকামে ইবরাহীমে সালাত আদায়, সাফা-মারওয়া সায়ী করা, জমজম কূপের পানি পান ও মিনায় কুরবানি করা এবং কিয়ামত পর্যন্ত মুসলিম উম্মাহ্ এখান থেকে প্রেরণা লাভ করবে।

  • ঈদের দিন রক্ত প্রবাহিত করার চেয়ে উত্তম কাজ আর নেই, সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যে কুরবানি করবে না সে যেন আমার ঈদগাহে না আসে কুরবানিদাতাকে তার পশুর শরীরের পশমের সমপরিমাণ সওয়াব দেয়া হবে এবং রক্ত যমিনে পড়ার পূর্বেই তা আল্লাহর দরবারে গৃহীত হবে। কুরবানি নিজ হাতে দেয়াটাই উত্তম। একান্ত সম্ভব না হলে কুরবানিদাতা যেন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখে। মূলত কুরবানি হলো রক্ত প্রবাহিত করা ও রক্ত দর্শন করা।

কুরবানির গুরুত্ব বর্ণনা করতে যেয়ে রসূল (সাঃ) বলেন ঈদের দিন রক্ত প্রবাহিত করার চেয়ে উত্তম কাজ আর নেই, সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যে কুরবানি করবে না সে যেন আমার ঈদগাহে না আসে কুরবানিদাতাকে তার পশুর শরীরের পশমের সমপরিমাণ সওয়াব দেয়া হবে এবং রক্ত যমিনে পড়ার পূর্বেই তা আল্লাহর দরবারে গৃহীত হবে। কুরবানি নিজ হাতে দেয়াটাই উত্তম। একান্ত সম্ভব না হলে কুরবানিদাতা যেন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখে। মূলত কুরবানি হলো রক্ত প্রবাহিত করা ও রক্ত দর্শন করা। কুরবানির পশু জবেহ করার সময় কুরবানিদাতা এ ঘোষণাই দিয়ে থাকে-নিশ্চয়ই আমার নামায, আমার যাবতীয় ইবাদত অনুষ্ঠান এবং আমার জীবন ও মৃত্যু কেবল আল্লাহরই জন্য-আল আনয়াম ১৬২। অর্থাৎ-আমি আমার নই,আমার পরিবার ও জাতিরও নই। আমি একান্তভাবে আল্লাহর। আমার বেঁচে থাকাটা হবে আল্লাহর জন্য এবং আমার মৃত্যুও হবে আল্লাহরই জন্য। আমি এ পৃথিবীতে আমার ,আমার পরিবার, আত্মীয়-স্বজন ও দেশবাসীর জন্য যা কিছু করি তা আল্লাহরই নির্দেশক্রমে।

আল্লাহর পথে ত্যাগ ও কুরবানির নজির শুধু ইবরাহীম (আঃ) নয় বরং আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা সকল নবী-রসূল ও তাঁর সঙ্গী-সাথীদের জীবনে ঘটেছিল। হযরত মুসা (আঃ) ইসা (আঃ), জাকারিয়া (আঃ), ইউসুফ (আঃ), আইয়ুব (আঃ) নূহ (আঃ), ইউনুস (আঃ) এবং আমাদের প্রিয়তম নবী মুহাম্মদ (সাঃ) ও তাঁর সাথীদেরসহ অতীতকালের সকল ঈমানদারদের জীবনেই ঘটেছিল। কুরআন মজিদে ঈমানদারদের নিপীড়ন-নির্যাতনের কথা বেশি উল্লেখ রয়েছে এবং লক্ষণীয় হলো, যিনি যতবেশি আল্লাহর প্রিয়ভাজন ও নৈকট্যপ্রাপ্ত তিনি ততবেশি পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছেন। এদিক দিয়ে আম্বিয়ায়ে কেরাম প্রথম কাতারে-আল্লাহর পক্ষ থেকে কখনো আবার জালেমদের পক্ষ থেকেও পরীক্ষা নেয়া হয়েছে।

বিপরীতভাবে জালেমদের করুণ পরিণতির কথা কমই উল্লেখ রয়েছে ; যেমন-নমরুদ, ফেরাউন, শাদ্দাদ, কেনান, আবু লাহাবসহ কয়েকজন। অবশ্য অতীতকালে জাতিগতভাবে ধ্বংসের কথা কুরআন মজিদে বেশ উল্লেখ রয়েছে। শেষ নবী ও তাঁর সাথীদের ওপর জুলুম-নির্য়াতনও ছিল অবর্ণনীয়। মক্কায় দীর্ঘ ১৩ বছর একতরফাভাবে শুধুই নির্যাতিত হয়েছেন। আবার আল্লাহর পক্ষ থেকে পরীক্ষাও কম নয়। একে একে পুত্রসন্তানদের ইন্তিকাল ছিল নবীর (সাঃ) জন্য চরম দুঃখ ও বেদনার। সে সময়ে বংশের লোকদের কাছ থেকে শান্তনার পরিবর্তে তাঁকে সহ্য করতে হয়েছিল বিদ্রুপ ও উল্লাস। আল্লাহপাক তাঁকে শান্তনা দিয়েছিলেন এবং কাওছার দানের সুসংবাদ শুনিয়েছিলেন।

কাওছার অর্থ সীমাহীন প্রাচুর্যতা- নাম, যশ, খ্যাতি, প্রভাব-প্রতিপত্তি, কর্তৃত্ব সবকিছু। সহায়-সম্বলহীন ও চরমভাবে উপেক্ষিত-নির্যাতিত মানুষটিই অল্প দিনের ব্যবধানে মদীনায় একটি সফল ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ইতিহাসের সবচেয়ে সম্মান, মর্যাদা, প্রভাব-প্রতিপত্তিসম্পন্ন ব্যক্তিত্বে পরিণত হন এবং যশ-খ্যাতি বলতে যা বুঝায় সবই তাঁর, পক্ষান্তরে তাঁর শত্রুরাই হলো জড়কাটা ও শিকড়কাটা। কাওছার লাভ ও টিকিয়ে রাখার জন্য আল্লাহ শর্ত জুড়িয়ে দিয়েছেন তোমার রবের উদ্দেশে নামায পড়ো ও কুরবানি কর-কাওছার। অর্থাৎ,আল্লাহর নৈকট্যলাভের জন্য একনিষ্ঠভাবে নামায আদায় এবং সবধরনের জুলুম-নির্যাতনের মোকাবেলায় পরম ধৈর্য ও ত্যাগ স্বীকার করতে হবে। রসূল (সাঃ)-এর বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রচারণার সয়লাব বয়ে চলেছিল এবং যেখানেই তাঁর পক্ষ থেকে দাওয়াত দান সেখানেই বাধা এসেছিল। কুরআনের প্রতি ছিল তাদের ভয়ানক বিদ্বেষ।

ফলে রসূল (সাঃ)-এর কুরআন পাঠে তাদের ছিল ঘোর আপত্তি। কুরআনের ভাষায়-এই কাফিররা বলে তোমরা কখনই কুরআন শুনবে না আর যখনই কুরআন শোনানো হয় তখনই শোরগোল করবে, হয়তো তোমরা জয়ী হবে। আমি অবশ্যই এ কাফিরদের কঠিন আযাবের স্বাদ আস্বাদন করাবো এবং নিশ্চয়ই সে কাজের প্রতিফল দেব যে আচরণ তারা করে এসেছে। এ জাহান্নামই হচ্ছে আল্লাহ তা’য়ালার শত্রুদের পাওনা সেখানে তাদের জন্য চিরস্থায়ী আযাবের ঘর থাকবে-হা-মী-ম আস সাজদা ২৬-২৮। আবু জেহেল-আবু লাহাবদের শতমুখে প্রচারণা আর তার মোকাবেলায় রসূল (সাঃ)-এর পক্ষ থেকে একক প্রচার কাফিররা বরদাশত করতে পারেনি। তাই তিনি গোপনে দাওয়াত দিতে থাকেন এবং টের পেলেই ইসলামের শত্রুরা ঝাঁপিয়ে পড়েছে।

হযরত বিলাল (রাঃ)-এর গভীর রাতে নামায আদায় তার মনিব সহ্য করতে পারেনি। তপ্ত বালুর ওপর শোয়ায়ে দিয়ে বুকে পাথর চাপিয়ে দেয়া হয়েছিল। এ চিত্র আজও দৃশ্যমান। আল্লাহর নৈকট্যপ্রাপ্ত অনেকে শুধুই নির্যাতিত হয়েছেন এবং পরম ধৈর্য অবলম্বন করে গেছেন প্রতিপক্ষের প্রতি কোন ক্ষোভ বা অমঙ্গল কামনা ছাড়াই। সূরা ইয়াসিনে এমন একটি ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায়। একটি লোকালয়ে হেদায়াতের জন্য আল্লাহপাক তিনজন রসূল প্রেরণ করেন এবং তাঁদের দীর্ঘ চেষ্টা–প্রচেষ্টার পর একজন লোক ইসলাম গ্রহণ করেন। ইসলাম গ্রহণের পর তিনি তাঁর জাতির কাছে ছুটে এসে বলেন তোমরা আনুগত্য কর সেই রসূলদের যারা তোমাদের নিকট কোন বিনিময় চান না এবং নিজেরা হেদায়াতের ওপর প্রতিষ্ঠিত-ইয়াসিন ২১। এ কল্যাণকামী লোকটিকে শেষ পর্যন্ত তার জাতির লোকেরা হত্যা করে এবং এর বদলে আল্লাহর পক্ষ থেকে বলা হয় দাখিল হও জান্নাতে। লোকটি তখন বলে ওঠেন-আফসোস আমার জাতির লোকদের জন্য তারা যদি জানতে পারতো কিসের বদৌলতে আমার রব আমাকে ক্ষমা করলেন ও সম্মানিত লোকদের মধ্যে গণ্য করলেন-ইয়াসিন ২৭। অত্যাচার-নির্যাতনের বিরুদ্ধে কোন প্রতিশোধ আকাক্সক্ষা নয় কোন অমঙ্গল কামনাও নয় বরং তাদের গোমরাহী স্মরণে দুঃখ-ভারাক্রান্ত হওয়া কোন স্বাভাবিক ব্যাপার নয় : এটা সম্ভব কেবল তাদেরই জন্য যারা অত্যন্ত শরীফ ও আল্লাহর একান্ত মকবুল বান্দা।

  • ভালো ও মন্দ কখনই এক নয় ; তুমি মন্দকে দূর কর সেই ভালো দ্বারা যা অতীব উত্তম তাহলে দেখবে তোমার জানের দুশমনরা প্রাণের বন্ধু হয়ে গেছে। আর এ গুণ কেবল তারাই লাভ করে যারা ধৈর্য ধারণ করে এবং এ লোক শুধু তারাই হয় যারা সৌভাগ্যের অধিকারী

আল্লাহ তাঁর নবীকে বলেছেন-ভালো ও মন্দ কখনই এক নয় ; তুমি মন্দকে দূর কর সেই ভালো দ্বারা যা অতীব উত্তম তাহলে দেখবে তোমার জানের দুশমনরা প্রাণের বন্ধু হয়ে গেছে। আর এ গুণ কেবল তারাই লাভ করে যারা ধৈর্য ধারণ করে এবং এ লোক শুধু তারাই হয় যারা সৌভাগ্যের অধিকারী–হা-মী-ম আস সাজদা ৩৪-৩৫। আসুন আমরা কুরবানীর ঐতিহাসিক এ ঘটনা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে আমি ও আমাদের পরিবারকে এক আল্লাহর জন্য উৎসর্গ করার মানসিকতা তৈরী করি। প্রিয় নবী (সা.) বলেছেন, আল্লাহ তাআলা তোমাদের স্বাস্থ্য-চেহারা এবং ধনসম্পদের প্রতি দৃষ্টিপাত করেন না ; বরং তিনি দৃষ্টি দেন তোমাদের অন্তর এবং আমলের প্রতি। সুতরাং কোরবানির পূর্বেই কোরবানিদাতার নিয়ত বা সংকল্প শুদ্ধ করে নিতে হবে।

লেখক :  ইসলামি চিন্তক ও গবেষক।