ই-পেপার | মঙ্গলবার , ২৩ জুলাই, ২০২৪

রাশিয়াকে অস্ত্র দিলে চীনের যা হবে!

রাশিয়া কয়েক দশক ধরে চীনের কাছে অস্ত্র বিক্রি করে আসছে। তারা চীনের সঙ্গে ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের একটি অস্ত্র চুক্তি করে ২০১৫ সালে। এর আগে রাশিয়া ২০০১ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত চীনের কাছে প্রতিবছর গড়ে ২০০ কোটি মার্কিন ডলারের অস্ত্র বিক্রি করেছে।

কিন্তু ইউক্রেন যুদ্ধ মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে। রাশিয়া এখন অস্ত্রের জন্য চীনের দিকে তাকিয়ে আছে। গত বছরের ২৪ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেনে হামলা শুরুর পর থেকে রাশিয়া ১ হাজার ৫০০টি ট্যাংক সহ মোট ৯ হাজার ৪০০ যুদ্ধ সরঞ্জাম হারায়। এ ছাড়া এক বছরের বেশি সময় ধরে যুদ্ধ পরিচালনা করতে গিয়ে যুদ্ধ সরঞ্জামের তীব্র সংকটে পড়েছে মস্কো।

মার্কিন গোয়েন্দাদের ধারণা, চীন রাশিয়াকে অস্ত্র সরবরাহের কথা ভাবছে। যুদ্ধের বর্তমান পরিস্থিতি অনুযায়ী, চীন যদি রাশিয়াকে অস্ত্র দেয়, তবে যুদ্ধের মোড় ঘুরে যেতে পারে।


  • যুক্তরাষ্ট্রের হুঁশিয়ারি; রাশিয়াকে কোনো রকম প্রাণঘাতী (সামরিক) সহায়তা দেওয়ার পদক্ষেপ নেওয়া হলে বেইজিংকে চড়া মূল্য দিতে হবে।


এদিকে গত ২৬ ফেব্রুয়ারি হোয়াইট হাউসের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জেক সুলিভান বলেছেন, রাশিয়াকে কোনো রকম প্রাণঘাতী (সামরিক) সহায়তা দেওয়ার পদক্ষেপ নেয়নি চীন; দেশটির কর্মকর্তাদের সাথে রুদ্ধদ্বার আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রও হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, এধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হলে বেইজিংকে চড়া মূল্য দিতে হবে।

মার্কিন গণমাধ্যম সিএনএন এর ‘স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন’ অনুষ্ঠানে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘(রাশিয়ার সাথে সম্পর্কে) বেইজিং কীভাবে এগোবে, অর্থাৎ সামরিক সহায়তা দেবে কিনা – সে বিষয়ে তাদের নিজেদেরই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কিন্তু, যদি তারা সেই পথ বেছে নেয়– তাহলে চীনকে প্রকৃত মূল্য দিতে হবে’।

অবশ্য এবিসি নিউজের ‘দিস উইক’ অনুষ্ঠানে দেওয়া পৃথক এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, বেইজিং এ ধরনের সহায়তা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়নি, তবে একইসঙ্গে এই উপায়টি তারা বিবেচনাতেও রেখেছে।

সুলিভান বলেন, মার্কিন কর্মকর্তারা তাদের চীনা সমকক্ষদের সাথে রুদ্ধদ্বার আলোচনাকালে বলেছেন, এই সিদ্ধান্ত নিলে দেশটিকে চড়া মূল্য দিতে হতে পারে। তবে গোপন ওইসব আলোচনার আরো বিস্তারিত জানাননি তিনি।

সাম্প্রতিক সময়ে রাশিয়াকে সামরিক সহায়তা না দিতে বার বার চীনকে হুঁশিয়ারি দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও তার ন্যাটো জোটের মিত্র দেশগুলো। পশ্চিমা কর্মকর্তারা মনে করছেন, বেইজিং এটা করতেও পারে। আর সেজন্যই প্রকাশ্যে কঠিন পরিণতির হুমকি দিচ্ছেন। রোববার চীনের বিষয়ে এমন ধারণার কথা জানিয়েছেন, মার্কিন গুপ্তচর সংস্থা-সিআইএ-র পরিচালক উইলিয়াম বার্নস।


  • মার্কিন গোয়েন্দাদের দেওয়া তথ্য অনুসারে, ড্রোনসহ বিভিন্ন মারণাস্ত্র রাশিয়ায় পাঠানোর কথা ভাবছে বেইজিং।


সিবিএস নিউজের ‘ফেস দ্য নেশন’ অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে বার্নস বলেন, ‘আমরা নিশ্চিত চীনের নেতৃত্ব (রাশিয়াকে) মারণাস্ত্র দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছেন। তবে এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি বলেই আমরা জানতে পেরেছি। তাছাড়া, প্রকৃতপক্ষে কোনো সমরাস্ত্র চালান পাঠানোর ঘটনাও আমরা দেখিনি’।

এর আগে মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের বৈদেশিক সম্পর্ক কমিটির চেয়ারম্যান ও রিপাবলিকান আইনপ্রণেতা মাইকেল ম্যাককল বলেন, মার্কিন গোয়েন্দাদের দেওয়া তথ্য অনুসারে, ড্রোনসহ বিভিন্ন মারণাস্ত্র রাশিয়ায় পাঠানোর কথা ভাবছে বেইজিং।

রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সঙ্গে চীনের সম্পর্কে গভীর সংকট চলছে। তারও আগে তাইওয়ান ইস্যু নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সম্পর্ক খারাপ যাচ্ছে। এর মধ্যে আবার যুক্তরাষ্ট্রের আকাশে চীনা বেলুন শনাক্ত হওয়ার পর দুই দেশের সম্পর্ক আরও তিক্ত হয়েছে। দুই দেশের মধ্যে শুরু হয়েছে কথার লড়াই।

এর মধ্যেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ও জার্মান চ্যান্সেলর ওলাফ শলৎজ বৈঠক করে রাশিয়াকে শায়েস্তা করার কথা বলেছেন। একই সঙ্গে চীন রাশিয়াকে অস্ত্র সরবরাহ করলে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছেন।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের পক্ষ থেকে চীনকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলা হয়েছে, রাশিয়াকে অস্ত্র দিলে চীনের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হবে। চীনের পক্ষ থেকে অবশ্য রাশিয়াকে অস্ত্র সরবরাহের কথা স্বীকার করা হয়নি।


  • জার্মান ম্যাগাজিন ডের স্পিগেল দাবি করে, চীনের কাছ থেকে ড্রোন পেতে আলোচনা করেছে রুশ বাহিনী।


তাছাড়া ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু পর থেকে চীনের কাছ থেকে একাধিকবার অস্ত্র সহায়তা চেয়েছে মস্কো। চীন বারবার মস্কোকে ফিরিয়ে দিয়েছে। এত দিন পর্যন্ত কেবল প্রাণঘাতী নয়, এমন অস্ত্র দিয়ে সহায়তা করেছে। তবে গত ২৩ ফেব্রুয়ারি জার্মান ম্যাগাজিন ডের স্পিগেল দাবি করে, চীনের কাছ থেকে ড্রোন পেতে আলোচনা করেছে রুশ বাহিনী।

ড্রোন নিয়ে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সঙ্গে দর–কষাকষি চলছে রাশিয়ার। চীনের বিংগো ইনটেলিজেন্ট অ্যাভিয়েশন টেকনোলজি আক্রমণের কাজে ব্যবহার করা যায়, এমন ড্রোন তৈরি করে থাকে। এ ড্রোন পেতেই চেষ্টা করছে রুশ বাহিনী। যুদ্ধক্ষেত্রে ইতিমধ্যে গত সেপ্টেম্বর থেকে এ ধরনের ড্রোন ব্যবহার করে আসছেন রুশ সেনারা।

বিশেষ করে ইউক্রেনের বিদ্যুৎ অবকাঠামোতে হামলার কাজে ড্রোনের ব্যবহার দেখা গেছে। ইউক্রেনের অভিযোগ, এ ধরনের হামলার ক্ষেত্রে ইরানের কাছ থেকে পাওয়া ড্রোন ব্যবহার করেছে রুশ বাহিনী।

প্রভাবশালী মার্কিন সংবাদপত্র ওয়াশিংটন পোস্ট বাইডেন প্রশাসনের কর্মকর্তাদের বরাতে জানা যায়, মস্কোকে গোলা সরবরাহের কথা ভাবছে বেইজিং। যুদ্ধে রাশিয়া ও ইউক্রেন উভয় পক্ষই সোভিয়েত যুগের ক্যালিবার ১২২ এমএম ও ১৫২ এমএম শেল ব্যবহার করে আসছে।

তবে এক বছর ধরে চলা এ যুদ্ধে রাশিয়ার গোলা ফুরিয়ে এসেছে। ইতিমধ্যে দেশটি বেলারুশে যে গোলার মজুত রেখেছিল, তা–ও শেষ করে ফেলেছে। উত্তর কোরিয়ার কাছ থেকে কিছু গোলাবারুদ পেয়েছিল। কিন্তু উত্তর কোরিয়া নিজেদের গোলাবারুদ নিঃশেষ করে ফেলা নিয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত। ইরানের কাছ থেকেও খুব বেশি কিছু পাওয়ার আশা নেই মস্কোর।

এখন মস্কোর ভরসার নাম চীন। তাদের কাছে যথেষ্ট গোলা রয়েছে। পেন্টাগনের গোয়েন্দা সংস্থার সাবেক কর্মকর্তা লোনি হেনলি বলেন, চীনের কাছে ঠিক কী পরিমাণ গোলা আছে, সে সম্পর্কে খুব বেশি জানা সম্ভব নয়। তবে তা অবশ্যই রাশিয়ার গোলা সংকট মোকাবিলায় যথেষ্ট হবে। বর্তমান সংঘাতে বড় পার্থক্য গড়ে দিতে পারে এই গোলা।

 

লেখক: সাংবাদিক

এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত রিপোর্ট