ই-পেপার | মঙ্গলবার , ২৩ জুলাই, ২০২৪

চীনা প্রতিষ্ঠান গোল্ডটেক্স গার্মেন্টসের যতপ্রকার জালিয়াতি

বন্ড সুবিধায় আমদানি করা হয়েছে ১০৭ টন কাপড়। কাপড় যাওয়ার কথা ছিল প্রতিষ্ঠানের বন্ড গুদামে। কিন্তু রাখা হয়েছে সিঅ্যান্ডএফের ভাড়া করা গুদামে। সেখান থেকেই খোলাবাজারে নিয়ে বিক্রির চেষ্টা করা হয়। কিন্তু সেই চেষ্টা রোধ করে এসব কাপড় জব্দ করে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। জব্দ করা কাপড়ের মূল্য প্রায় ১০ কোটি টাকা। এসব কাপড় আমদানি করেছে সাভারের ঢাকা রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা (ডিইপিজেড) গোল্ডটেক্স গার্মেন্টস লিমিটেড।

তথ্যের ভিত্তিতে জানা যায়, বন্ড সুবিধার কাপড় চট্টগ্রামের উত্তর হালিশহর এলাকার এএফটি লজিস্টিক লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠানের গুদামে রাখা হয়েছে। সেখানে থেকে খোলাবাজারে বিক্রি করা হবে—এমন গোপন সংবাদ পান কাস্টমস গোয়েন্দা কর্মকর্তারা। পরে সেখানে অভিযান চালিয়ে ১০৭ দশমিক ২৬ মেট্রিক টন কাপড় জব্দ করা হয়। যার আনুমানিক মূল্য ১০ কোটি টাকা। কাপড়গুলো আমদানি করেছে সাভার আশুলিয়ার ঢাকা রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকার (ডিইপিজেড) প্রতিষ্ঠান গোল্ডটেক্স গার্মেন্টস লিমিটেড। আর কাপড়গুলো খালাসের দায়িত্বে ছিল আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট স্পিডওয়ে লজিস্টিক। গুদামটি স্পিডওয়ে লজিস্টিক ভাড়া নিয়েছে।

নিয়ম অনুযায়ী, বন্ড সুবিধার কাপড় আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের বন্ড গুদামে যাওয়ার কথা। কিন্তু বন্ডেড প্রতিষ্ঠানের গুদামে না নিয়ে সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের ভাড়া করা গুদামে মজুত করা হয়েছে। এই বিষয়ে স্পিডওয়ে লজিস্টিকের স্বত্বাধিকারী মো. খসরুল আলম আকন ও বন্ডেড প্রতিষ্ঠান গোল্ডটেক্স গার্মেন্টস লিমিটেডের বিরুদ্ধে চট্টগ্রাম নগরীর হালিশহর থানায় একটি ফৌজদারি মামলা করা হয়েছে। এছাড়া বন্ড সুবিধার অপব্যবহার করায় ঢাকা কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা করেছে।

বন্ডেড প্রতিষ্ঠান গোল্ডটেক্স গার্মেন্টস লিমিটেডের বন্ড সুবিধায় আমদানি করা অন্যান্য চালান বিষয়ে নজরদারি করে কাস্টমস গোয়েন্দা। এতে এতে দেখা যায়, একই আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান বন্ড সুবিধায় আরও চার কনটেইনার কাপড় আমদানি করেছে। কনটেইনারগুলো চট্টগ্রাম বন্দরে রয়েছে। তবে এখনও বিল অব এন্ট্রি দাখিল করেনি। কাস্টমস গোয়েন্দা কর্মকর্তারা চারটি কনটেইনার চিহ্নিত করেন। পরে চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের এআইআরের কর্মকর্তা ও বন্দর কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে চারটি কনটেইনার ফোর্স কিপডাউন করে কায়িক পরীক্ষা করা হয়। যাতে দেখা গেছে, চার কনটেইনারে ১০৮ দশমিক ৪৭ মেট্রিক টন বন্ড সুবিধার কাপড় রয়েছে; যার শুল্কায়নযোগ্য মূল্য ৩ কোটি ৮১ লাখ ৫৭ হাজার ৪৪৪ টাকা এবং আনুমানিক বাজার মূল্য ১১ কোটি ৪৪ লাখ ৭২ হাজার ৩৩২ টাকা।

কাস্টমস গোয়েন্দার তদন্তে দেখা গেছে, প্রাপ্ত দলিলাদি আমদানিকারক গোল্ডটেক্স গার্মেন্টস লিমিটেডের নামে ইস্যু করা। প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধির আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বেপজা কর্মকর্তারা আইপি ইস্যু করেছে। সূত্রমতে, নিয়ম অনুযায়ী আইপি ইস্যুর সময় আবেদনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র দিতে হয়। আর সেই কাগজপত্র বেপজা কর্মকর্তারা আইপি ইস্যুর সময় যাচাই করতে হয়। কিন্তু আইপি ইস্যুর সময় কাগজপত্র দেয়া হয়নি। তবে কাগজপত্র ছাড়াই কীভাবে বেপজা কর্মকর্তারা আইপি ইস্যু করেছেন, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

তদন্তে আরও দেখা গেছে, আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান বন্ড সুবিধার ১০৭ টন কাপড় কোনো কাঁচামাল আমদানি করেনি বলে কাস্টমস গোয়েন্দাকে চিঠি দিয়ে জানিয়েছে। তবে বেপজা হতে আইপি গ্রহণসহ আমদানি দলিলাদির আলোকে বিষয়টি সুস্পষ্ট যে, আমদানিকারক গোল্ডটেক্স এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরস্পর যোগসাজশে বন্ড সুবিধায় শুল্ককর ফাঁকি দিয়ে পণ্য চালানগুলো খালাসের অপচেষ্টা করা হয়েছে। বন্ড লাইসেন্স প্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের বন্ড সুবিধায় আমদানি করা পণ্যের অবৈধ মজুত, সরবরাহ ও খোলাবাজারে বিক্রয় বা বিক্রির প্রচেষ্টা চোরাচালান বলে গণ্য হয়।

প্রতিষ্ঠানটি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সহায়তায় দীর্ঘদিন ধরে বন্ড সুবিধার কাপড় খোলাবাজারে বিক্রি করে আসছে। বন্ড সুবিধার অপব্যবহার করায় কাস্টমস আইন অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। অপরদিকে, প্রতিষ্ঠান বিএলগুলোর বিপরীতে কোনো বৈধ এলসি বা সেলস কন্ট্রাক্টের মাধ্যমে ব্যাংকিং চ্যানেলে বৈদেশিক মুদ্রা প্রেরণ করেননি। বিষয়টি মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন অনুযায়ী তদন্ত করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা করার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে বলে জানান কাস্টমস গোয়েন্দার অতিরিক্ত মহাপরিচালক মো. বশীর আহমেদ।